ময়মনসিংহ-৮: ভোটের চেয়ে জোটের সমীকরণ জটিল

ময়মনসিংহ-৮: ভোটের চেয়ে জোটের সমীকরণ জটিল

ঈশ্বরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে প্রার্থীদের পদচারণে বাড়ছে পাড়া-মহল্লায়। পথসভা, মতবিনিময় কিংবা ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমে প্রার্থিতা প্রকাশ করে জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে ভোটের চেয়ে জোটের সমীকরণ জটিল।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-৮ আসনটি। উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটার ৩ লাখ ২০ হাজার ৯২৭টি; যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৬১ জন, মহিলা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৬৩ জন ও হিজড়া ভোটার রয়েছেন তিনজন।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ১১টি জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ চারবার, জাতীয় পার্টি চারবার ও বিএনপি তিনবার জয়লাভ করে। এ হিসেবে তিনটি দলের প্রার্থীরাই আসনটিকে নিজ দলের ঘাঁটি বলে মনে করেন। কিন্তু বিগত দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি জোটবদ্ধ নির্বাচন করায় দুবারই এ আসনটি থেকে জয়লাভ করে জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম। তবে এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা এ আসনে জোটবদ্ধ নির্বাচন হলেও ছাড়তে নারাজ। আওয়ামী লীগের প্রার্থী কর্মী-সমর্থকরা এবার নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন চায় এ আসনে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের এমপি না থাকায় এলাকা উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে।

তবে মনোনয়ন, বিগত উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন নিয়ে দলের মধ্যে মতবিরোধ থাকায় কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা চায় দল তাকে মনোনয়ন দেবে যে সবসময় মাঠে থেকে কর্মীদের খোঁজখবর রাখেন এবং বিপদে পাশে দাঁড়ান। কর্মী-সমর্থকদের কথা নির্বাচন এলেই যারা অতিথি পাখির মতো এলাকায় বিচরণ করেন তাদের মধ্য থেকে কেউ যেন মনোনয়ন না পায়। কারণ তারা নির্বাচনের পর আর এলাকায় আসেন না এবং তাদের খোঁজখবর রাখেন না।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে মাঠে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুছ ছাত্তার, উপজেলা পরিষদের আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান সুমন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য আবু বকর সিদ্দিক দুলাল ভূঁইয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাফির উদ্দিন আহমেদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহ মনজুরুল হক, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি মাসুদ হাসান তূর্ণ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহিম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য তরিকুল হাসান তারেক ও লায়ন লুৎফুল গণি টিটু।

একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অতিরিক্ত মহাসচিব ও প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য শাহ নুরুল কবীর শাহীন ও ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহ মাজেদ বাবু।

অন্যদিকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপির) প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাড. ড. আওরঙ্গজেব বেলাল জোটগত কিংবা একক দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জোটবদ্ধ নির্বাচনের ফলে হিসাব-নিকাশ উল্টে যায়। গত নির্বাচনেও এ আসনটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি জোটের শরিক দলের প্রার্থীর কাছে ছেড়ে দেন।

তাই সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, এ আসনটিতে ভোটের চেয়ে জোটের রাজনীতি জটিল। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা মাঠে থাকলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে এখন সংশয় না কাটায় বিএনপির প্রার্থীরা মাঠে প্রচারণায় ঝড় তোলেনি। তবে বিএনপির প্রার্থীরা জানান, মাঠে তাদের নির্বাচনি প্রস্তুতি রয়েছে।

জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম জানান, দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় পার্টি যদি এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং আমাকে মনোনয়ন দেয় তা হলে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব অন্যদিকে যদি মহাজোটে থাকে তা হলেও এই আসনটি আমি চাইব।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুছ ছাত্তার জানান, বিগত ১০ বছর এলাকার মানুষ উন্নয়নবঞ্চিত হয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, এবার নৌকার মনোনয়ন দিয়ে বিগত আমার সময়ের উন্নয়নের ধারায় ফিরে আসবে এ এলাকাটি।

মাহমুদ হাসান সুমন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলে কাজ করে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করছি। তাই প্রধানমন্ত্রী এ আসনে আমাকে নৌকার মনোনয়ন দিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আশা পূর্ণ করবেন।

শাহ নুরুল কবীর শাহীন বলেন, আমরা ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছি, যার ফলে এখনও নির্বাচন নিয়ে ভাবছি না। তবে আমাদের দাবি আদায় হলে আমরা নির্বাচনে আসব এবং বিগত সময়ের মতো আমিই দল থেকে মনোনয়ন পাব এবং ভোটে জয়লাভ করব।

সাফির উদ্দিন আহমেদ জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর উপজেলার নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে কাজ করছি তাই নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা এ আসনে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে।

আবু বকর সিদ্দিক দুলাল ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আস্থার ঠিকানা ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি তার প্রতিদান দিতে পারব বলে বিশ্বাস রাখি।

মাসুদ হাসান তূর্ণ জানান, আমি জন্মগতভাবেই আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান আর ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই মাঠে কাজ করে আসছি। আমার কর্মকা- বিবেচনায় নিয়ে নেত্রী আমাকে মানোনয়ন দিলে বিজয়ী হয়ে আসব।

শাহ মনজুরুল হক বলেন, প্রতিশ্রুতি নয়; উন্নয়নই মূল লক্ষ্য-এটাই আমার অঙ্গীকার। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে উপজেলার মানুষের পাশে থেকে আমার অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করব।

প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহ মাজেদ বাবু বলেন, দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে আমার প্রস্তুতি রয়েছে এবং মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *